বছরে বিনা মজুরিতে করা গৃহস্থালি কাজের শ্রমমূল্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে যদি নারীরা গৃহস্থালি ও সেবাযত্নের কাজের জন্য মজুরি পেতেন তাহলে এর মোট মূল্য দাঁড়াত ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এসব কাজ ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ নারীই করে থাকেন। হিসাবটি ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মিলনায়তনে হাউজহোল্ড প্রডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টে (এইচপিএসএ) এসব তথ্য জানানো হয়। বিবিএস ও ইউএন উইমেন যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুর্শিদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিংহ।
অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিবিএসের উপপরিচালক আসমা আখতার। এ সময় তিনি জানান, সময় ব্যবহার জরিপ ২০২১ এবং শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ হিসাব করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ইউএন উইমেনের নুবাইরা জেহেন ‘কেয়ার ক্যালকুলেটর’ নামের একটি সরঞ্জাম ব্যবহার করে দেখান, একজন মানুষ প্রতিদিন কতটা সময় অদৃশ্য শ্রমে ব্যয় করেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে সাত গুণ বেশি সময় দেন অবৈতনিক কাজে। একজন নারী বছরে প্রায় ২ হাজার ১০০ ঘণ্টা সময় দেন রান্না, ঘর সামলানো এবং শিশু ও প্রবীণের যত্নে। অন্যদিকে একজন পুরুষ এ কাজে ব্যয় করেন গড়ে মাত্র ৩ শতাধিক ঘণ্টা। এ কারণে মোট অদৃশ্য শ্রমের প্রায় ৮৮ শতাংশই বহন করছেন নারীরা।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে শ্রমের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে নারীদের শ্রমমূল্য ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি এবং পুরুষের ৬০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অবৈতনিক যত্নমূলক কাজে শ্রমমূল্য রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নারীদের অবৈতনিক যত্নমূলক কাজে মূল্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং ৪০ হাজার কোটি রয়েছে পুরুষদের।
অনুষ্ঠানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ মাহিন্থান জোসেফ মারিয়াসিংহাম এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘নারীর অদৃশ্য শ্রমকে জাতীয় অর্থনীতিতে দৃশ্যমান করার উদ্যোগ বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় অগ্রণী অবস্থানে নিয়ে গেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এ খাতে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনায় দিকনির্দেশনা দেবে।’
উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ‘নারীর শ্রম দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির ছায়ায় ছিল। এ প্রতিবেদন সে অমূল্য অবদানকে দৃশ্যমান করল। যত্ন অর্থনীতির (কেয়ার ইকোনমি) জন্য একটি ভিন্ন মূল্যবোধ ব্যবস্থার প্রয়োজন। নারীর বিনা মজুরির কাজ নিয়ে মানুষের বিদ্যমান মানসিকতা এমনি পরিবর্তন হয়ে যাবে না। এজন্য গবেষণা ও জরিপের মতো তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।’
গীতাঞ্জলি সিং বলেন, ‘যত্ন কোনো খরচ নয়, এটি একটি বিনিয়োগ। ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নারীর অবদান অগণিত। কিন্তু গভীরভাবে প্রোথিত লিঙ্গবৈষম্য ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতিফলনের কারণে নারীর যত্ন কাজের অবমূল্যায়ন করা হয়। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’